পেশোয়ারে এফসি সদর দফতরে আত্মঘাতী হামলা: নিহত ছয়, নিরাপত্তা জোরদার

পাকিস্তানের পেশোয়ারে ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি সদর দফতরে আত্মঘাতী হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান পরিচালনার দৃশ্য। পেশোয়ার এফসি সদর দফতরে আত্মঘাতী হামলার পর ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা, ছবি জিও নিউজ

অনলাইন আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার রাজধানী পেশোয়ারে আবারও রক্তাক্ত হামলা ঘটেছে। সোমবার (২৪ নভেম্বর) সকাল ৮টার দিকে আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি (এফসি)-এর সদর দফতরে সংঘটিত আত্মঘাতী ও সশস্ত্র হামলায় কমপক্ষে তিনজন সন্ত্রাসী এবং তিনজন এফসি সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর আরও কয়েকজন সদস্য। পেশোয়ারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহরে দিনের শুরুতেই এমন হামলা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

দ্য ডনসহ পাকিস্তানের একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারির এই সদর দফতরটি একটি ব্যস্ত জনবহুল অঞ্চলে অবস্থিত, যা একটি সামরিক সেনানিবাসের কাছাকাছি হওয়ায় এর নিরাপত্তা বরাবরই কঠোর। সোমবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস—এদিনই সকালে প্রধান কম্পাউন্ডে অ্যাসেম্বলি চলছিল, ফলে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা কর্মীদের আনাগোনা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ঠিক ওই সময়েই অতর্কিত হামলা চালায় তিনজন সশস্ত্র আত্মঘাতী জঙ্গি।

পেশোয়ার ক্যাপিটাল সিটি পুলিশ অফিসার (সিসিপিও) ড. মিয়াঁ সাঈদ আহমদ সাংবাদিকদের জানান, তিনজন আত্মঘাতী হামলাকারী এফসি সদর দফতরের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। এর মধ্যে একজন মূল গেটেই বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে, আর ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গেট এলাকা। বিস্ফোরণের পর দ্রুতই বাকি দুই সন্ত্রাসী কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে নির্বিচার গুলি চালায়।

এফসি সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে অবস্থান নেন এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়। সিসিপিও ড. সাঈদ আহমদ জানান, বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলায় দুই হামলাকারীকে কম্পাউন্ডের ভেতরেই হত্যা করা হয়। পরে সংঘর্ষের মধ্যে শেষ হামলাকারীও বিস্ফোরণে বা গোলাগুলিতে নিহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনী পুরো কম্পাউন্ড ঘিরে ফেলে এবং কয়েক ঘণ্টার অভিযানের মাধ্যমে পুরো এলাকা তল্লাশি করে।

নিরাপত্তা সূত্র জানায়, এ হামলায় তিনজন এফসি সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং আহত হয়েছেন আরও দু’জন। আহতদের নিকটবর্তী সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধাসামরিক বাহিনী, যাদের মূল দায়িত্ব হলো সীমান্ত এলাকা, পুলিশিং অপারেশন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা। গত জুলাই মাসে নতুন করে বাহিনীটির পুনঃনামকরণ করা হয় এবং সদর দফতরকে আরও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়। কিন্তু সন্ত্রাসীদের এহেন সমন্বিত আত্মঘাতী হামলা সেই নিরাপত্তা যে সম্পূর্ণ দুর্ভেদ্য নয়, সেটাই আবারও প্রমাণ করল।

এফসি সদর দফতরে রয়েছে ব্যারাক, আবাসিক কোয়ার্টার, হাসপাতাল এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা। সকালবেলার অ্যাসেম্বলির সময় এই স্থাপনায় সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মকর্তার উপস্থিতি থাকে। এমন সময় হামলা চালানো ছিল সন্ত্রাসীদের পূর্বপরিকল্পিত ও সুপরিকল্পিত কৌশলের ইঙ্গিত।

হামলার পরপরই পুরো এলাকায় জরুরি সহায়তা জোরদার করা হয় এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশপাশের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেয়, যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। পাশাপাশি হামলার ধরন, বিস্ফোরকের উৎস এবং হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে।

এখনো পর্যন্ত কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকটি বড় হামলা হয়েছে, তার বেশিরভাগের পেছনে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জড়িত ছিল। যদিও এই হামলাটি টিটিপি করেছে বলে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হামলার পর পাকিস্তান সরকার এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলেছেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং এ ধরনের হামলা প্রতিহত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে।

পেশোয়ার শহর অতীতেও বহুবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ, এফসি সদস্য, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামরিক স্থাপনাগুলোই সবসময় জঙ্গিদের প্রধান টার্গেট হয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ হামলা দেশের ভেতরে নতুন করে সন্ত্রাসবাদ পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

স্থানীয় জনগণ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ধরনের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, সাধারণ মানুষের জীবনহানি বন্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন জরুরি। তারা আরও বলছে, যে কোনো সংঘাতের প্রাথমিক শিকার হয় সাধারণ মানুষ—এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি।

হামলার ঘটনাটি দেশব্যাপী তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিন্দার বন্যা বইছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সামরিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবাই বলছেন, পেশোয়ারের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন হামলা নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল।

সামগ্রিকভাবে, এফসি সদর দফতরে এই হামলা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। জঙ্গিদের পুনঃউত্থান এবং হামলার ধরনে পরিবর্তন জানিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনী আশা করছে, তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের নেটওয়ার্ক দ্রুতই শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং এর পেছনে থাকা শক্তিগুলোকে আইনের আওতায় আনা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *