বাংলাদেশ–ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু: ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতায় জোর

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের কূটনৈতিক আলোচনার প্রতীকী ছবি, দুই দেশের পতাকা পাশাপাশি উড়ছে। ঢাকায় সাক্ষাতে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার—ফরাসি রাষ্ট্রদূত ও প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস। ছবি : সিএ প্রেস উইং

অনলাইন ডেস্ক:

ঢাকা, ২৫ নভেম্বর ২০২৫:
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার ও নতুন মাত্রায় রূপ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স। গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অংশীদারত্ব—এই চারটি মূল অক্ষকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন নতুন ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে। মঙ্গলবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতকালে তিনি এ বার্তা তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক বিশেষ মুহূর্তে রয়েছে। এই সময়টি ফ্রান্স ও বাংলাদেশের পার্টনারশিপকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।” তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, প্যারিস সরকারের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি।

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশ—ফ্রান্সের দৃষ্টি কেন্দ্রবিন্দুতে

রাষ্ট্রদূত সেরে-শারলে উল্লেখ করেন, ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উন্মুক্ত সমুদ্রপথ, নৌ-নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সংযোগ ও জলবায়ু নিরাপত্তা জোরদারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ ফরাসি নাগরিক বসবাস করেন, যা ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন শতাংশ। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ফ্রান্সের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন,
“ইন্দো-প্যাসিফিক একটি উন্মুক্ত ও অবাধ চলাচলের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অঞ্চল। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স এখানে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার বড় সুযোগ দেখছে।”

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, ব্লু-ইকোনমি সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলে এই সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলেও রাষ্ট্রদূত মত দেন।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ফ্রান্সের আশা—শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য, উৎসবমুখর

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রদূত আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে শুভকামনা জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের আয়োজন এবং সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হতে পারে বলেও তিনি আশা করেন।

তবে তিনি সতর্কভাবে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনের সময় বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, গুজব ও সামাজিক বিভাজন সৃষ্টিকারী তৎপরতা ইউরোপের বেশ কিছু দেশে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তাই বাংলাদেশকেও এমন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ জানান তিনি।

অর্থনীতি, উন্নয়ন ও এলডিসি উত্তরণে ফরাসি সমর্থন

গোটা আলোচনাজুড়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসঙ্গ উঠে আসে। রাষ্ট্রদূত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে ফ্রান্স বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন প্রকল্পে যুক্ত হতে আগ্রহী।

বিশেষ করে বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে উত্তরণের সময় শুল্কসুবিধা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে ফ্রান্স দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

রাষ্ট্রদূতের ভাষায়,
“এই উত্তরণ যেন নির্বিঘ্ন ও সফল হয়, সে বিষয়ে ফ্রান্স প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”

ইউনূসের কৃতজ্ঞতা—ফ্রান্স বাংলাদেশের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর ও উন্নয়নযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি। এ সময় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সবুজ প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের ধারাবাহিক সহযোগিতা দেশের উন্নয়নকে টেকসই করছে বলেও মন্তব্য করেন ইউনূস।

তিনি আরও উল্লেখ করেন,
“ফ্রান্স বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার। চলমান সংস্কার কার্যক্রম ও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নেওয়া প্রস্তুতি সম্পর্কে আমরা আপনাকে অবহিত করছি, এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।”

অধ্যাপক ইউনূস স্মৃতিচারণ করে জানান, প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি ফ্রান্সে একাধিক বার সফর করেছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি জলবায়ু ঝুঁকি ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ মানবিক উন্নয়নে ফরাসি সহায়তা আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ জানান।


সাক্ষাৎটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ফ্রান্স তার বৈশ্বিক কৌশলে বাংলাদেশকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, নৌ-নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির মতো খাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *