আজ শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আকস্মিক এই কম্পন কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী থাকলেও রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। বহু মানুষ ঘরবাড়ি, অফিস, দোকানপাট থেকে দ্রুত বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, মাত্রা বা তীব্রতা সম্পর্কে এখনো ইউএসজিএস (USGS) আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে ভূমিকম্পের তীব্রতা ও কম্পনের অনুভূতি দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি মাঝারি শক্তির একটি ভূমিকম্প হতে পারে, যার কেন্দ্র বাংলাদেশের খুব দূরে নয়।
রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, “আমি বাসায় ল্যাপটপে কাজ করছিলাম। হঠাৎ দেখি টেবিল কেঁপে উঠছে। মুহূর্তেই বুঝলাম ভূমিকম্প। সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে নিয়ে নিচে নেমে যাই। কয়েক সেকেন্ড হলেও অনেক তীব্র মনে হয়েছে।”

ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসেন। গুলশান, বনানী, উত্তরা, ফার্মগেট, রামপুরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী—সব এলাকাতেই একই দৃশ্য দেখা গেছে। বহু অফিসের কর্মীরা কাজ থামিয়ে ভবনের নিচে নেমে আসেন। আবাসিক ভবনগুলোতে কয়েক সেকেন্ড ধরে কাঁপুনি অনুভূত হওয়ায় অনেকে মনে করেন বড় ধরনের কম্পন হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বরিশাল থেকেও ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সময় প্রায় একই সময়ে সেখানে কম্পন টের পান সাধারণ মানুষ। বরিশাল নগরীর চাঁদমারী এলাকার বাসিন্দা রাজীব আহমেদ জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি একটি দোকানে বসেছিলেন। হঠাৎ দোকানের কাঁচের তাক এবং ঝোলানো সাইনবোর্ড কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, “হঠাৎ সব কাঁপতে শুরু করলো। মনে হলো দোকানটা দুলছে। বাইরে বের হয়ে দেখি অনেকে দৌঁড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে।”
ভূমিকম্পের সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোবাইল নেটওয়ার্কে সাময়িকভাবে চাপ তৈরি হয়। অনেকেই আতঙ্কে স্বজনদের ফোন করতে গিয়ে নেটওয়ার্ক সমস্যা অনুভব করেন। তবে কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, “বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও বঙ্গোপসাগর এলাকার বিভিন্ন ফল্ট লাইন সক্রিয় রয়েছে। তাই ছোট-বড় কম্পন প্রায়ই অনুভূত হয়। কিন্তু ভবন নির্মাণে অনিয়ম এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর পরিবেশের কারণে ঝুঁকি অনেক বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের ভূমিকম্পটি কত মাত্রার ছিল তা এখনো জানা যায়নি। USGS তথ্য প্রকাশ করলে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। কম্পনের তীব্রতা ও দুলুনির ধরন দেখে অনুমান করা যায়—এটি মাঝারি মাত্রার হতে পারে।”
মানুষের প্রতিক্রিয়া
রাজধানীতে আজকের ভূমিকম্পে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেলেও বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বহু ভবনে ফায়ার এক্সিট বা নিরাপদ বের হওয়ার পথ সঠিকভাবে ব্যবহারের অনুশীলন নেই। এ কারণে এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
মিরপুরের বাসিন্দা শামীমা সুলতানা বলেন, “অফিসে আমরা জানতাম জরুরি অবস্থায় কোথায় বের হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা এত দ্রুত ঘটে যে বুঝে উঠতে পারিনি কোন সিঁড়ি দিয়ে নামবো। সবাই ভিড় করে নামতে চেয়েছিল।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ফেসবুক ও X-এ (টুইটার) অনেকেই জানান তারা কোথায় কতটা কম্পন অনুভব করেছেন। কেউ কেউ ভবন দুলতে থাকা ভিডিওও পোস্ট করেন।
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায়ও কম্পন অনুভূত হওয়ার কথা জানান ব্যবহারকারীরা।
প্রশাসনের সতর্কতা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—এ মুহূর্তে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে নগরবাসীকে সচেতন থাকতে এবং ভবনের ভেতরে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, ভূমিকম্প সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী নির্দেশনা জানানো হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ যা বলছে
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, “ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায় এবং কত মাত্রার ছিল তা জানা গেলে ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। ভূমিকম্পের পর দেশব্যাপী সব জেলা প্রশাসনকে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।”
সচেতনতা জরুরি
বাংলাদেশে ভবনের গুণগত মান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে ভূমিকম্প সবসময়ই বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—প্রতিটি ভবনে নিয়মিত ড্রিল বা অনুশীলন করা উচিত, যাতে মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে সঠিকভাবে নিরাপদে সরে যেতে পারেন।
আজকের ভূমিকম্পে যদিও প্রচুর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু এটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে—ভূমিকম্প-সচেতনতা বাড়ানো ও দুর্যোগ প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।
“বিস্তারিত আসছে…”
