অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানী ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে আজ সোমবার সকাল থেকেই ছিল ভিন্ন রকম উত্তেজনা ও সতর্কতা। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা সিদ্দিক, ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণার দিন হিসেবে আদালত এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে করা এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সোমবার সকাল ৯টার আগেই পুরান ঢাকার আদালত এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রবেশপথে বসানো হয় অতিরিক্ত চেকপোস্ট। প্রত্যেককে তল্লাশি শেষে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। আদালত চত্বরে ছিল বিজিবি, র্যাব, মহানগর পুলিশের প্রচুর সদস্য। রায়কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতে পারে এমন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেয়া হয় সর্বোচ্চ সতর্কতা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি মিয়া মোহাম্মদ আশিষ বিন হাছান বলেন,
“আজ রায়কে সামনে রেখে নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি অতিরিক্ত দুই প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দুই প্লাটুন বিজিবির সদস্য দায়িত্বরত আছেন। সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি থানার সদস্যরাও মাঠে আছেন। র্যাব রাস্তায় টহলে রয়েছে। বর্তমানে কোনো শঙ্কা নেই, তবে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।”
এদিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কারাগারে থাকা একমাত্র সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে দেখতে কিছু লোকজন জড়ো হলেও নিরাপত্তা বাহিনী কাউকে ভিড় জমাতে দেয়নি।
মামলার পটভূমি
রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও টিউলিপ সিদ্দিকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় বলা হয়—নির্দিষ্ট নীতিমালা উপেক্ষা করে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের প্লট বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায় আসে এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২৫ নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আজকের দিনকে রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারণ করেন বিচারক।
মামলার অন্যান্য আসামিরা
হাসিনা–রেহানা–টিউলিপ ছাড়াও মামলার আরও ১৪ আসামি হলেন—
- গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার
- সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার
- অতিরিক্ত সচিব অলিউল্লাহ
- সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন
- রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের পিএ মো. আনিছুর রহমান মিঞা
- রাজউকের সাবেক সদস্য তন্ময় দাস
- রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন
- মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী
- রাজউকের সাবেক পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম
- সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম
- উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ
- সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন
- সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ
তাদের প্রত্যেকেই বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। তবে খুরশীদ আলম ছাড়া বাকি আসামিরা জামিনে ছিলেন।
কেন এত নিরাপত্তা?
সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে থাকে। যেকোনো ধরনের ভিড় বা অস্থিরতা রোধে আদালত এলাকায় সাধারণ মানুষের সমাগমও সীমিত করা হয়। সাংবাদিকদেরও নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে সংবাদ কাভার করতে বলা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন,
“এ ধরনের মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালত এলাকায় ভিড় বাড়ে। অনেকে উত্তেজিত হন। তাই আগেভাগেই নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এখনো পরিস্থিতি শান্ত।”
রায়ের অপেক্ষায় দেশ
মামলাটিকে ঘিরে দেশে–বিদেশে রাজনৈতিকভাবে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের জড়িত থাকা, বিদেশি সাংসদ টিউলিপ সিদ্দিকের নাম থাকা এবং রাজউকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনোযোগ এ মামলার দিকে ছিল শুরু থেকেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের প্রভাব বাংলাদেশে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হতে পারে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
আদালতের ভেতরে–বাইরে উত্তেজনা
আদালতের প্রধান ফটকে সকাল থেকে কড়া তল্লাশি চলে। লোহার গেটের সামনে কয়েক দফা নির্দেশনা দেন ডিউটিরত পুলিশ সদস্যরা—
✔ কেবল অনুমতিপ্রাপ্তই প্রবেশ করতে পারবেন
✔ ব্যাগ–প্যাক চেকিং বাধ্যতামূলক
✔ সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে হবে
সাধারণ মানুষের প্রবেশ একপ্রকার বন্ধই ছিল।
একজন আইনজীবী বলেন,
“আজ আদালতে প্রবেশ করতেই বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল। এ রায় শুধু বিচারাঙ্গনের ঘটনা নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।”
বিচারকের বক্তব্যের অপেক্ষা
বেলা ১১টার দিকে পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন রায় ঘোষণা করবেন। আদালত প্রাঙ্গণে তখন পর্যন্ত উত্তেজনা থাকলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিটি মোড়ে সতর্কভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
বিচারকের সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
