অনলাইন আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাকে ঘিরে। সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় যখন তিনি ঘুষ, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলায় পূর্ণ ক্ষমা চেয়ে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন। এই আবেদন প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানী তেল আবিবের রাজপথ বিক্ষোভকারীদের দখলে চলে যায়।
গত রোববার (৩০ নভেম্বর) রাতে তেল আবিবের প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে হাজারো নাগরিক জড়ো হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা মনে করেন, নেতানিয়াহু কোনো ধরনের দায় স্বীকার না করে এবং বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে চেয়ে দেশের গণতান্ত্রিক আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একজন তরুণীর ভাষায়—“আইন সবার জন্য সমান। প্রধানমন্ত্রী বলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না।”
৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তিনটি দুর্নীতি মামলার বিচার দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মামলাগুলোতে ঘুষ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, সরকারি পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলসহ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি অভিযোগগুলো সবসময় অস্বীকার করে এসেছেন। তবে মামলাগুলোর অগ্রগতি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছেই।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে কয়েদির মতো কমলা রঙের পোশাক পরে নেতানিয়াহুকে উপহাস করেন। আবার কেউ কেউ কলার স্তূপ সাজিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বোঝাতে চান যে প্রধানমন্ত্রী “কলার রিপাবলিকের মতো আচরণ করছেন”—অর্থাৎ আইন ও প্রথার তোয়াক্কা করছেন না।
সরকারবিরোধী প্রতিবাদের অন্যতম মুখ শিকমা ব্রেসলার বলেন—
“তিনি কোনো দায়ভার নিচ্ছেন না। যেভাবে দেশকে বিভক্ত করেছেন, সেটিরও কোনো মূল্য দিচ্ছেন না। এখন তিনি বিচার বাতিল করতে চাইছেন। দেশের ভবিষ্যৎ আজ ঝুঁকির মুখে।”
বিক্ষোভে অংশ নেন বিরোধীদলীয় এমপি নাআমা লাজিমিও। তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী যদি ক্ষমা পেয়ে যান, তাহলে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
এদিকে নেতানিয়াহুর আইনজীবীরা প্রেসিডেন্টের দফতরে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে তাদের ক্লায়েন্ট এখনও বিশ্বাস করেন—আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি বেকসুর খালাস পাবেন। তবুও রাষ্ট্রের “মঙ্গলের কথা ভেবে” তারা ক্ষমার আবেদন করেছেন।
লিকুদ পার্টির প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন—
“আমার আইনজীবীরা আজ দেশের প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার অনুরোধ পাঠিয়েছেন। দেশের মঙ্গল চান এমন যে কেউ এই পদক্ষেপকে সমর্থন করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”
প্রেসিডেন্ট হার্জোগের কার্যালয় জানায়, রোববার তারা নেতানিয়াহুর পাঠানো আবেদন পেয়েছেন এবং সেটি পর্যালোচনার জন্য জমা রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের দফতর আইনজীবীদের পাঠানো চিঠিটিও প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুকে ক্ষমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইসরাইলের প্রেসিডেন্টকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এই ঘটনাও ইসরাইলি রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই ক্ষমার আবেদন শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়—এটি ইসরাইলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছেন কিনা, তা নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রতিবাদকারীরা আশঙ্কা করছেন—প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমার আবেদন গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে সরকার সমর্থকরা বলছেন—নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তবে পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে ইসরাইলের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
দেশের সাধারণ মানুষের ভাষায়—“ক্ষমা চাইতেই পারেন, কিন্তু আইনের বিচারে দাঁড়ানো তার দায়িত্ব।”
বিক্ষোভের ঢেউ তাই আপাতত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
